No icon

DEBASMITA BANERJEE

এক ইচ্ছাশক্তির নাম অভিনেত্রী দেবস্মিতা

কেহেতে হ্যায় আগর কিসি চিজ কো দিল সে চাহো, তো পুরি কায়নাত তুমহে উসসে মিলানে কী কোশিশ মে লাগ জাতি হ্যায়।”- শাহরুখ খান অভিনীত 'ওম শান্তি ওম' সিনেমার -এর এই বিখ্যাত ডায়লগের কথা মনে আছে!  শুধুমাত্র ফিল্মের গন্ডিতে  নয়  নিজের ইচ্ছাশক্তির দ্বারা সব কিছুই জয় করা সম্ভব তা বাস্তবে প্রমাণ করেছেন এই বঙ্গ ললনা।  অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং একইসঙ্গে দক্ষ অভিনয়ের গুনে আজ তিনি টলিউড থেকে বলিউড, ভোজপুরী এমনকি অসম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এক সফলতম অভিনেত্রী। আবার একাধারে তিনি একজন পরিচিত মডেল।  শুধু কি তাই অভিনয়ের পাশাপাশি আঁকা এবং রান্নার পরিসরে তিনি দিব্যি পটু। আর এহেন এই প্রতিভাময়ী নারী আর কেউ নন তিনি হলেন অভিনেত্রী দেবস্মিতা ব্যানার্জী। আজ একান্ত সাক্ষাৎকারে জেনে নেওয়া যাক তাঁর কিছু না বলা অধ্যায়।

★ ছোটবেলাটা তোমার কেমন ছিল ?

- আমি কাঁচড়াপাড়ার মেয়ে। আমি, বাবা মা এই হল আমার পরিবার। আমি আগে খুব  ভীতু  প্রকৃতির ছিলাম। কড়া শাসনে আমার দিনগুলো কেটেছে।

★অভিনয় জগতে আসা কিভাবে?

- ছোটবেলা থেকে অভিনেত্রী হওয়ার শখ ছিল আমার। খুবই স্ট্রাগল করে আমার এই জগতে আসা। আমার  বাবা মা চাইতেন না যে আমি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আসি। কিন্তু আমার ছিল অদম্য জেদ। সবাইকে বুঝিয়ে অনেক কষ্টে আমার এগিয়ে চলা। এরপর যেহেতু একটি মেয়ে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অভিনেত্রী হতে এসেছে অথচ সে এই রাস্তাটা সম্বন্ধে পুরোপুরি অজানা তাই প্রতি মুহূর্তে নানান বাধা অতিক্রম করে আমি আমার স্বপ্নপূরণ করি।

★তোমার প্রথম ব্রেক?

- আমি তখন সেকেন্ড ইয়ারের পড়ি। একদিন আমার  বাড়ির সামনের কালিমন্দিরে একটি প্রোডাকশন হাউস থেকে মা কালীর উপর একটা মিউজিক ভিডিও শুট করতে এসেছিল। আমিও সেই শ্যুটিং দেখতে যাই ।সেইসময় আমি ডিরেক্টরের চোখে পড়ে যাই । তারপর তিনি আমাকে ডেকে পাঠান এবং  আমায় তাঁর অ্যালবামে কাজ করার সুযোগ করে দেন।ওইদিনের সেই এক্সাইটমেন্ট আজও আমি ভুলিনি। তারপর এই ইন্ডাস্ট্রিতে যাতে না আসতে পারি তার জন্য অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। একসময় বাড়ি থেকে আমার পকেটমানি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবুও আমি হেরে যায়নি। আমিও টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ওই টাকা দিয়ে স্টুডিও পাড়ায় আসতাম। আমি  কেরিয়ার শুরু করেছিলাম সিরিয়াল দিয়ে।  ২০০৭ সালে আকাশ বাংলায় 'পুলিশ ফাইলস' দিয়ে আমার অভিনয় জীবনের হাতেখড়ি। সেইসময় 'পুলিশ ফাইলস' -এর টিরাপিও খুব ভালো ছিল। এরপর 'টাটকা গল্পে আটকা মাস' যেখানে পাওলিদি (পাওলি দাম) -এর সাথে অভিনয় করি। জি বাংলার 'রানী কাহিনী', 'রাজা এন্ড গজা', ইটিভি বাংলার 'উত্তরণ', তারপর দুর্গাপুজোর সময় আকাশ বাংলায় একটি কমেডি সিরিয়াল হত 'যা কলা এ কি জ্বালা' -সেখানে মা লক্ষীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। এরপর ২০১১ সালে পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের হিন্দি ছবি 'ত্রয়োদশী'-যেখানে রবীন্দ্রনাথের ১৩টি কবিতার উপর ১৩টা শুট হয়েছিল। আর তার মধ্যে দুটোয় লিড রোলে 'ফাঁকি'-র বিনু এবং 'ক্যামেলিয়া'-র কমলা চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাই।

★ বাংলার পাশাপাশি তুমিতো অসমীয়া,  হিন্দি ,ভোজপুরী ফিল্ম করেছ। সে সম্পর্কে কিছু বলো?

- আমি অনেক জায়গায় প্রোফাইল পাঠাতাম। আর হঠাৎই দেখি অসম ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে স্বনামধন্য পরিচালক মঞ্জু বোরা আমাকে কল করেন। ২০১২সালে আমার প্রথম অসমীয়া ফিল্ম 'বরলার ঘর'। সেটি ছিল কমেডি ফিল্ম। আমার চরিত্রের নাম ছিল 'মুক্তা' । যদিও সেই ছবিতে আমার সব ডায়লগ ছিল বাংলায়।  ফিল্মটি রিলিজ হয় এবং খুব হিট হয়। একইসঙ্গে অসমে 'মুক্তা'কেও দর্শকেরা খুব পছন্দ করে। সেখানে কাজ করলেও আমি মনে মনে ঠিক করি অসমীয়া ভাষা শিখতেই হবে। আসতে আসতে অসমীয়া ভাষাও শিখি। এরপর কিছু অসমীয়া ছবি করি যেমন- 'চুমা পরশতে'।সেই সিনেমায় ডায়লগ ছিল পুরো অসমীয়া ভাষায়। এরপর সাইকো থ্রিলার ছবি'ক্রোধ', কমেডি মুভি 'আহিয়াসে'-তে আমি অভিনয় করি। এছাড়া গায়ক জুবিন গর্গ অভিনীত ছবি 'মিশন চায়না'-য় আমি গেস্ট অ্যাক্ট্রেস হিসাবে অভিনয় করি। অসমীয়া ছবির পাশাপাশি ২০১৬ সালে হিন্দি ছবি 'বিহারী সর্দার' এবং ২০১৮ সালে অফার আসে ভোজপুরী সিনেমার। সিনেমাটির নাম 'রাজা জানি'। সেখানে ভোজপুরী সুপারস্টার খেসারী লাল যাদব-এর বিপরীতে আমি অভিনয় করি। সেই সিনেমাও খুব হিট হয়। এছাড়া প্রচুর শর্ট ফিল্মস করি। এইভাবে বিভিন্ন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আমি অভিনয় করার সুযোগ পাই। 

★ অভিনয়ের পাশাপাশি তুমি মডেলিং করেছ ,সে সম্পর্কে কিছু বলো? 

- হ্যাঁ ,অভিনয়ের পাশাপাশি আমি মডেলিং-ও করেছি। শুরুটা ২০১৪সাল থেকে। সেইসময় আমি কলকাতায় একটা র‌্যাম্প শোয়ে শো স্টপার হিসাবে ওয়াক করি।তখন থেকেই আমি ভাবি যে আমি মডেলিং টা কেন করতে পারি না?  বরাবরই চ্যালেঞ্জ নিতে ভালো লাগে আমার। আর ঠিক যেমন ভাবা তেমন কাজ!  তারপর মডেলিং করতে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে মডেলিং-এর কন্ট্রাক্ট বাড়তে লাগল।এইভাবে দুটোকে নিয়ে আমি সমানতালে কাজ করে চলেছি। 

★ তোমার আপকামিং প্রজেক্ট সম্পর্কে কিছু বলো?

- সম্প্রতি একটি বাংলা ছবিতে অভিনয় করছি। যার নাম 'বিউটিফুল লাইফ'। এটি একটি অফবিট সিনেমা। এখানে হিরো একজন পেন্টার। তাঁর মডেলের চরিত্রে আমি অভিনয় করছি। যদিও এই চরিত্রে অভিনয় করাকালীন আমাকে ওজন কমাতে হয়েছিল। এছাড়াও এই ছবিতে রয়েছেন ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, টোটা রায়চৌধুরী। সম্ভবত হোলিতে ছবিটি রিলিজ হওয়ার কথা চলছে। এছাড়াও আমি লাস্ট ইয়ার দুবাইতে চারটে শর্ট ফিল্ম করলাম। একটি হল 'লাইট ইন দ্যা ডার্ক'। ইতিমধ্যে ইউটিউবে দেখা যাচ্ছে এই ফিল্ম। দর্শকদের খুব ভালো লেগেছে। এছাড়া 'ফ্রেন্ডস্', '২৭অক্টোবর' এবং 'দ্যা গাইড'। এই শর্ট ফিল্মটিও দর্শকেরা খুব পছন্দ করেছে। পাশাপাশি অসমীয়া এবং ভোজপুরী সিনেমা নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এখনও কিছু ফাইনাল হয়নি।

★ অভিনয় জীবনে কোন স্মরণীয় মুহূর্ত?

- যেহেতু আমি জিরো থেকে  কেরিয়ার শুরু করেছি তাই স্মরণীয় মুহূর্ত আমার অনেকগুলো।

আমার অভিনয় জীবনে এমনওসময় গেছে যখন প্রত্যেকে বলেছিল আমার দ্বারা কিছু হবে না । একসময় আমি একটু ডিপ্রেশনে চলে যাই। সেইসময়  কিছুদিনের জন্য ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকে ব্রেক নিয়ে নিজেকে আরো তৈরি করার দিকে মনোযোগ দিই।অ্যাক্টিং শিখতে লাগলাম। যদিও কোন প্রফেশনাল ইনস্টিটিউটে গিয়ে নয়। সিনিয়র থিয়েটার আর্টিস্ট প্রশান্ত পাল-এর কাছে অভিনয় এবং একইসঙ্গে ডান্স শিখেছিলাম  বাংলা ইন্ডাস্ট্রির বিখ্যাত কোরিওগ্রাফার শ্রীনু মাস্টার-এর কাছে। সেই একবছর আমি পুরোপুরি ভাবে অ্যাক্টিং এবং ডান্স শিখেছিলাম যা আমার কাছে স্মরণীয় মুহূর্ত।

আরেকটি হল, একদিন একটি শ্যুটিং চলাকালীন আমি সকাল থেকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে প্র্যাকটিস করছিলাম। সেইসময় হঠাৎই অনস্পট ঘোড়াটা আমায় নিয়ে জঙ্গলে ছুটে চলে যায়। তখন আমি খুবই নার্ভাস হয়ে পড়ি। যদিও আমি খুব ঈশ্বর বিশ্বাস করি। একদিকে ঈশ্বরকে স্মরণ করছি আর অন্যদিকে সেই ঘোড়াটা জঙ্গল থেকে যখন রাস্তায়  ওঠে সেইসময় আমি ওর গলা জড়িয়ে ধরে জোরে লাফ দিই। আমার আজও অদ্ভুত লাগে এত জোরে লাফ দেওয়া সত্ত্বেও আমার কোথাও কোন আঘাত লাগেনি।

আরেক স্মরণীয় মুহূর্ত, আমার দ্বিতীয় অসমীয়া মুভির শ্যুটিং করছিলাম  ব্রহ্মপুত্র নদী তার মাঝখানে ছোট দ্বীপের মত রয়েছে এমন একটি জায়গায়। তার গায়ে লেগেছিল দুটো পাথর।আমি আমার হিরো শুট করছি। হঠাৎ ই আমি লক্ষ্য করি ওই দুটো পাথরের মাঝখানে কিছু একটা আছে। আমি বলতে থাকি ওটা  সাপ!দেখি , সেইসময় সেটা দেখে আমার ডিরেক্টর খুব পুজো করতে শুরু করেদিলেন।তারপর ওখানে শ্যুটিং হল। পরবর্তীক্ষেত্রে জানতে পারি যে ওই এলাকায় এই প্রথম কোন শ্যুটিং হল কারণ অসমের সবথেকে বেশি সাপ ওই এলাকায় থাকে ।বিশেষত কোবরা সাপ এবং জানতে পারি ওই সাপটাও ছিল কোবরা। এরকম বেশ মজার অভিজ্ঞতার সাক্ষি আমি।

★ভবিষ্যতে কার কার সাথে অভিনয় করতে চাও?

- নায়কের কথা বলতে গেলে অবশ্যই শাহরুখ খান। উনি আমার ফেবারিট  অ্যাক্টর । এছাড়াও সালমানের সাথে অভিনয় করতে চাই। আর নায়িকাদের মধ্যে অভিনয় করতে চাইব আমার প্রিয়  দক্ষিণী অভিনেত্রী শোভনা চন্দ্রকুমার-এর সাথে। 

★ তুমি কার কার সাথে স্ক্রিন শেয়ার করার সুযোগ পেয়েছ?

- বাংলায় ঋতুপর্ণাদির (ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত) সাথে স্ক্রিন শেয়ার করে খুবই ভালো লেগেছে। এছাড়া টোটা রায়চৌধুরীর সাথে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা বেশ ভালো। এছাড়া অসমে পরিচালক মঞ্জু বোরা-র মত বড় মাপের ডিরেক্টরের সাথে কাজ করার সুযোগ পাওয়া যেটা আমার জীবনে বড় পাওনা। একইসঙ্গে অসমের প্রসিদ্ধ অভিনেতা নিপন গোস্বামী, অভিনেত্রী পূর্ণিমা সাইকিয়া, বিশিষ্ট অভিনেতা বিষ্ণু খারঘরিয়া -এর সাথে যেমন অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি তেমনি অনেক শিখেছি।যা আমার কাছে বিরাট প্রাপ্তি। 

★ তোমার ড্রিম প্রজেক্ট?

- বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে আমার এই  জার্নিটা নিয়ে যদি কোনদিন কোন প্রজেক্ট হয় তাহলে সেটাই হবে আমার ড্রিম প্রজেক্ট। 

★ এমন কোন পরিচালক যার সাথে কাজ করার ইচ্ছে আছে ?

- ভোজপুরীর ইন্ডাস্ট্রির  আর রাজকুমার। অসমে ডিরেক্টর জানু বড়ুয়া এবং বলিউড ইন্ডাস্ট্রির মধুর ভান্ডারকর-এর সাথে কাজ করার ইচ্ছে আছে।

★ অভিনেত্রী ছাড়া কি হতে চাইবে?

- অভিনেত্রীর পাশাপাশি আমার ডিরেকশনে আসার ইচ্ছে আছে। সেক্ষত্রে অবশ্যই আমার প্রথম প্রায়রিটি থাকবে নতুনদের সুযোগ দেওয়া।

★অভিনয়ের পাশাপাশি তুমিতো ভালো রাঁধতে পারো। কি কি ডিশ রাঁধতে বেশি ভালো লাগে?

- হ্যাঁ, আমি রাঁধতে ভালোবাসি। বিভিন্ন ধরণের এক্সপেরিমেন্টাল ডিশ করতে ভালো লাগে। তবে থাই, আরবি রান্না আমার বেশি পছন্দের।

★নতুন বছরের কি কি রেজোলিউশন?

- অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে আরো  তৈরি করা।

 আরেকটু ওজন কমাতে চাই।

আর অবশ্যই দর্শকদের  আরো ভালো ভালো সিনেমা উপহার দিতে চাই।

সবশেষে বলাই যায়, অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর লড়ে যাওয়ার মন্ত্রে অভিনয় জগতে একটাই নাম অভিনেত্রী দেবস্মিতা ব্যানার্জী।

দেবস্মিতা!  আপনি এইভাবে আপনার স্বপ্নের লক্ষ্যে এগিয়ে চলুন। 24×7 taazasamachar-এর তরফ থেকে আপনার জন্য রইল আন্তরিক শুভেচ্ছা।

Comment